আমার নাম রাসেল । জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পার করে আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন একটা নাম বারবার হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায় লাখি খালা। আমার বিধান খালা লাখি। তিনি শুধু আমার খালা ছিলেন না, ছিলেন আমার পরম বন্ধু, আমার আশ্রয়।ছোটবেলা থেকেই আমি লাখি খালার খুব কাছাকাছি ছিলাম। তাঁর হাতের রান্না, তাঁর আদুরে ডাক আর তাঁর মায়াবী চোখ দুটো আমাকে সবসময় মুগ্ধ করত। আমাদের মধ্যে কোনো জটিলতা ছিল না, ছিল না কোনো ভুল বোঝাবুঝি। আমাদের সম্পর্কটা ছিল একদম স্বচ্ছ আর পবিত্র। আমি তাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতাম, আর তিনি আমাকে আগলে রাখতেন নিজের সন্তানের মতো।মনে পড়ে সেই বিকেলের কথা, যখন আমরা বারান্দায় বসে চা খেতাম। বাইরের আকাশটা তখন আবছা লাল হয়ে আসছিল। খালা বলতেন, “রাসেল রে, তুই বড় হয়ে অনেক বড় মানুষ হবি।” তাঁর সেই কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। আমি তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরে থাকতাম, যেন সেই মায়াটা কোনোদিন হারিয়ে না যায়।আমাদের প্রেমের গল্পটা ছিল নিঃস্বার্থ। কোনো জাগতিক চাওয়া ছিল না আমাদের মাঝে। শুধু ছিল একে অপরের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর টান। যখনই আমি কোনো সমস্যায় পড়তাম বা মন খারাপ হতো, খালার কাছে ছুটে যেতাম। তিনি কোনো কথা না বলেই শুধু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, আর আমার সব কষ্ট নিমেষেই উধাও হয়ে যেত। তাঁর সেই স্পর্শে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছিল। আমি ভাবতাম খালা কেউ নেই তাই আমার এখন তা পাশে থাক খুব প্রয়োজন।
আজ হয়তো সময় বদলে গেছে, অনেক কিছু বদলে গেছে। কিন্তু আমার হৃদয়ের এক কোণে সেই লাখি খালার মায়া আর ভালোবাসা আজও অমলিন। তিনি আমার জীবনের সেই সুন্দর অধ্যায়, যা আমি বারবার পড়তে চাই। তাঁর প্রতি আমার এই ভালোবাসা কোনোদিন ফুরাবে না। তিনি ছিলেন আমার পৃথিবী, আর আজও আমার স্মৃতির পাতায় তিনি চিরকাল অম্লান। সে সময় খালার সব দুঃখ কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। তবে খালা সে
হ্যাঁ, একদম ঠিক। লাখি খালার সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল এতটাই গভীর যে, তাঁর হাসি আর কান্না দুটোই ছিল আমার নিজের। আমি শুধু তাঁর আদরের ভাগ্নি ছিলাম না, ছিলাম তাঁর ছায়া।
তাঁর জীবনের সুখের মুহূর্তগুলোতে আমি সবার আগে থাকতাম। যখন তিনি কোনো খুশির খবর পেতেন বা কোনো ছোটখাটো প্রাপ্তিতে তাঁর মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত, আমি তখন তাঁর পাশে বসে সেই আনন্দ ভাগ করে নিতাম। তাঁর সেই হাসিতে আমি আমার নিজের আনন্দ খুঁজে পেতাম। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম, হাসতাম আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতাম। সেই মুহূর্তগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে রঙিন সময়।কিন্তু শুধু সুখ নয়, খালার দুঃখের দিনেও আমি ছিলাম তাঁর সবচেয়ে বড় অবলম্বন। যখন তাঁর মন খারাপ হতো বা কোনো কারণে তিনি বিষণ্ণ থাকতেন, আমি তাঁর পাশে চুপচাপ বসে থাকতাম। অনেক সময় কোনো কথা না বলে শুধু তাঁর হাতটা ধরে রাখতাম। আমি জানতাম, অনেক সময় কথা বলার চেয়ে পাশে থাকাটাই বেশি জরুরি। তাঁর চোখের জল মোছানোর জন্য আমি সবসময় প্রস্তুত থাকতাম। তাঁর মনের ভার লাঘব করতে আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করতাম। খালার দুঃখগুলো যেন আমার নিজেরই মনে হতো। তাঁর চোখের কোণে জল দেখলে আমার বুকটা ফেটে যেত। আমি চাইতাম তাঁর সব কষ্ট আমি নিজের কাঁধে তুলে নিতে। এই যে একে অপরের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষমতা এটাই বোধহয় আমাদের সম্পর্কটাকে এত পবিত্র আর শক্তিশালী করে তুলেছিল। তাঁর প্রতিটি আবেগ আমি অনুভব করতে পারতাম, আর এটাই ছিল আমাদের ভালোবাসার আসল ভিত্তি।লাখি খালার বিধবা হওয়ার সেই দিনগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। জীবনটা যেন হঠাৎ করেই থমকে গিয়েছিল। তাঁর সেই চেনা হাসিটা হারিয়ে গিয়ে চোখের কোণে একরাশ বিষণ্ণতা জমা হয়েছিল। সেই এক বছর আমার কাছে যেন কাটছিল এক অনন্তকালের মতো।খালার জীবনটা তখন ছিল একাকীত্বের চাদরে ঢাকা। ঘরটা যেন বড় বড় হয়ে গিয়েছিল, চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি চাইতাম সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে তাঁকে আবার হাসাতে, কিন্তু আমি জানতাম না কীভাবে তাঁর মনের ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলব। আমি শুধু তাঁর পাশে থাকতাম। প্রতিদিন তাঁর কাছে যেতাম, তাঁর সাথে গল্প করার চেষ্টা করতাম, তাঁর হাতের কাজ বা ছোটখাটো প্রয়োজনে সাহায্য করতাম। আমি চাইতাম তাঁকে বোঝাতে যে, তিনি একা নন আমি আছি তাঁর পাশে।সেই এক বছর আমি দেখেছি কীভাবে একজন মানুষ নিঃশব্দে নিজের শোককে বয়ে বেড়ায়। খালার চোখের সেই শূন্য দৃষ্টি আমাকে তিলে তিলে কষ্ট দিত। তিনি হয়তো মুখে কিছু বলতেন না, কিন্তু তাঁর নীরবতা অনেক কথা বলত। তাঁর সেই একাকীত্বকে ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছি। মাঝে মাঝে যখন তিনি খুব একা বোধ করতেন, আমি তাঁর কাছে বসে থাকতাম দীর্ঘক্ষণ। কোনো কথা হতো না, শুধু আমরা দুজন বসে থাকতাম এক অদ্ভুত নীরবতায়। সেই নীরবতা যেন আমাদের মধ্যকার সেই গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ ছিল।সেই এক বছর আমাকে শিখিয়েছিল ধৈর্য আর সহমর্মিতা কী। আমি বুঝেছিলাম, ভালোবাসার মানে শুধু আনন্দ ভাগ করে নেওয়া নয়, বরং কারো কঠিনতম সময়ে তাঁর ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। লাখি খালার সেই এক বছরের নিঃসঙ্গতা আমি আমার হৃদয়ে অনুভব করেছি, আর সেই অনুভবই আমাদের সম্পর্কটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
সেই এক বছর খালার একাকীত্ব আর বিষণ্ণতার মাঝে আমাদের সম্পর্কটা এক অদ্ভুত মোড় নিতে শুরু করেছিল। আমি তখনো ছিলাম সেই আগের সাগরিকা খালার সব আবদার পূরণ করা, তাঁর পাশে বসে গল্প করা আর তাঁকে হাসানোর চেষ্টা করা। আমি ভাবতাম এটাই আমাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক। কিন্তু আমি জানতাম না যে, আমার এই নিঃস্বার্থ উপস্থিতি আর আগলে রাখার ধরন খালার মনের গভীরে অন্যরকম এক অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল।খালার চোখে তখন এক ধরণের পরিবর্তন আমি লক্ষ্য করতাম না। তিনি যখন আমার দিকে তাকাতেন, সেই দৃষ্টিতে শুধু মায়া বা স্নেহের ছায়া থাকতো না; মাঝে মাঝে সেখানে এক ধরণের গভীর আকুলতা বা এক অদ্ভুত টান ফুটে উঠত। হয়তো তিনি আমার স্পর্শে বা আমার উপস্থিতিতে এমন এক প্রশান্তি খুঁজে পেতেন যা তিনি আগে কখনো পাননি। কিন্তু আমি তখনো খুব অল্পবয়সী এবং সরল। আমি ভাবতাম খালা হয়তো আমার প্রতি আরও বেশি মায়াবী হয়ে উঠেছেন তাঁর একাকীত্বের কারণে। আমি যখন তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম বা তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরতাম, আমি শুধু তাঁর কষ্ট কমাতে চাইতাম। কিন্তু খালার সেই নীরব চাহনি বা তাঁর শরীরের সামান্য কাঁপুনি যা হয়তো আমার খুব কাছে থাকার কারণে হতো সেগুলো আমি বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছি আমার ভুল ছিল না, বরং আমার সরলতা ছিল। আমি শুধু তাঁর বন্ধু আর ভাগ্নি হয়েই থেকে গেছি, অথচ তাঁর হৃদয়ে আমার জন্য যে ভিন্নরকম এক টান তৈরি হচ্ছিল, সেই সংকেতগুলো আমি তখন অবলীলায় এড়িয়ে গিয়েছিলাম। সেই সময়টা ছিল এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। একদিকে খালার নিঃসঙ্গতা আর অন্যদিকে আমার অজান্তে তাঁর মনে আমার প্রতি তৈরি হওয়া সেই ভিন্নতর অনুভূতি যা আমি বুঝতে পারিনি, কিন্তু আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই নীরবতাগুলো অনেক না বলা কথা বলে যাচ্ছিল।